ও স্বপ্ন ও অপ্রেম
ও স্বপ্ন ও অপ্রেম
মসৃণ। তুলতুলে বিশেষণগুলো মস্তিষ্কে চারিয়ে যায়। অথচ এর ভেতরে পুরো পৃথিবী তৈরি হচ্ছে। রূপ রঙ রস মিলে। অস্থি তরুণাস্থি মিলে রক্তপিণ্ডটি ক্রমশ জমাট বেঁধে একটা ছোট্ট মানুষ তৈরি হচ্ছে। তাকে পরখ করার জন্য বউয়ের নরম পেটে কান রাখে নাজমুল। স্ত্রীর তলপেটে হাত বুলিয়ে দেয়। শিহরণ লাগে সাফিনার। এই অনুভব বোঝানোর নয়। যারা মা হয় তারা জানে। মধ্যরাতের গরম ছাপিয়ে গিয়ে উঠে আসে ছোট ছোট লাথি। এত দুষ্টু হয়েছে আজকাল! নাজমুল বালিশে মাথা রেখে ভাবে জলের ভেতর যেন ডুবে যাচ্ছে। চেতনা হারানোর মতো। সাফিনার মুখেচোখে ঘাম। অঘোরে ঘুমোচ্ছে। ওর হাতটা তখনো সাফিনার পেটটাকে জড়িয়ে আছে। জড়িয়ে থাকলেও সে আর বাচ্চাটার লাথি ফিল করছেনা। ছোট ছোট স্বপ্নগুলো শিমূল তুলোর মতো কোথায় যেন উড়ে যাচ্ছে। বমি পাচ্ছে। মাথা ঘুরছে। বুক ঠেলে উঠে আসছে কান্না। কেন যে এরকম হয়? সাফিনাকে বলাও হবেনা। হয়তো আবারও অসুস্থ হয়ে পড়বে। এই ট্রমা থেকে তাকে কিভাবে বের করে আনবে বুঝতে পারেনা।
জল ছেড়ে দিলে বাথরুম জুড়ে পড়ে থাকে থুতু বমি। কেন এরকম হচ্ছে? হওয়ার কথা নয়। তবু হচ্ছে। ইদানীং টেনশন করলেই মাথাঘোরা হচ্ছে। কান গরম হচ্ছে। ঘাড়ের পিছনে জল দিলে একটু স্বস্তি। বমিগুলো ড্রেনের দিকে এগোতে থাকে। নাজমুল মাথাটা তুলে নিয়ে গামছা দিয়ে মোছে।
আরে আপনি চিন্তা করবেননা। আরেকজন ডাক্তার দেখাতে হবে। আপনি কি আপনার বাচ্চার হার্টবিট গুলো শুনতে চান? শুনুন। ইস মিস করছে। মিস করছে। আপনার বাচ্চাটা ভীষণ দুষ্টু। পজিশন ঘন ঘন চেঞ্জ করছে। দাঁড়ান একটু ওয়েট করি। এই যে। দশমিনিট পরে খুঁজে পেলাম। হেঁ হেঁ। আপনি টেনশন করবেন না। কিস্যু হবেনা। রিস্ক তো আছে। উপরওয়ালার ওপর বিশ্বাস রাখুন। ঠিক আছে। হাঁটুন হাঁটুন। হাঁটুন। হাঁটুন।
পা দুটো জমে যাচ্ছে। সবই টের পাচ্ছিল। সাফিনা পাশ ফেরে। নাজমুল বাইরে। প্রেসার বেড়েছে সম্ভবত। এই নাটক দুজনকে'ই করতে হচ্ছে। রাত্রে ঘুম কম হচ্ছে। ডেলি এংজাইটির ওষুধ খেয়ে ঘুমোতে ইচ্ছে করেনা। মড়ার মতো চুপচাপ শুয়েছিল। পেটে হাত রেখে নাজমুল ঘুমিয়ে পড়েছে। তারপর ধড়ফড় করে উঠে গেল। কোথায় যাচ্ছে? ইচ্ছে হলেও চুপ করেই থাকলো। আর কাঁদতে ইচ্ছে করছেনা। দেড় বছর হলো। বাচ্চাটাকে এখনো ফিল করে সে। মাঝেমধ্যেই মনে হয় বাচ্চাটা ভাসছে পেটের ভেতর। লাথি মারছে। লাথি মারছে। না না লাথি মারছে না। বাচ্চাটা মারা গেছে প্লিজ চুপ করো। এতরাতে কেঁদোনা। তোমার বাচ্চার রুহ কষ্ট পাবে। এরকম কোরোনা। ডেলি একই কথা ভালো লাগেনা। ট্রমা থেকে বেরিয়ে এসেছে সাফিনা। কিন্তু নাজমুলের সেই একই কথা আর ভালো লাগেনা। নারীর একটা মায়ের কান্না, ট্রমা। কষ্ট আবেগ সমস্ত নারীর। কতগুণ? না বমি করা নাজমুল কখনো টের পাবেনা।
নার্সদের সাদা পোশাক। জুতো। জুতোর শব্দ। স্যালাইন। এসির আওয়াজ সবগুলো বাড়াবাড়ি করছে। আবার হচ্ছে। আবার আবার। কোনটা অতীত কোনটা বর্তমান ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ে সাফিনা।
নাজমুল দরজা খোলে। স্যাণ্ডো গেঞ্জি খুলে এসে শুয়ে পড়ে। শরীর ক্লান্ত। এখন শরীর জাগে। অকারণে। এই শরীরটাকে গাঙুরের জলে ভাসিয়ে দিতে ইচ্ছে হয়। ঘুমোনোর সবচেয়ে ভালো টেকনিক হচ্ছে। নিজেকে সমুদ্রের মাঝে ভাসমান কাঠের ওপর কল্পনা করা। এভাবে চোখ বুজে কল্পনা করলে নাকি তাড়াতাড়ি ঘুম ধরে। আরেকটা টেকনিক হচ্ছে মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের। একমিনিটে ঘুমিয়ে পড়ার আশ্চর্য তরিকা। প্রথমে জোরে শ্বাস নাও। তারপর এক দুই তিন চার করে ছাড়তে থাকো। শরীর ছেড়ে দিলে ঘুম। আরামসে।
কিন্তু আজকে ঘুম আসেনা। আজকে ঘুম আসার নাম নেই। খুব বৃষ্টি হচ্ছে। গণেশ চতুর্থী। সাফিনার চাপ আসছেনা। ডাক্তার চলে গেছেন খেতে। হাসপাতালের বাইরে সিগারেটের ওপর টিক টিক করছিল একটা খরগোশ। আসুন। আপনার ওয়াইফকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়েছে। চিন্তা করবেননা। আমি যাচ্ছি। ডাক্তার গটগটিয়ে ওপরে উঠে যান। সিড়ির ওপর খরগোশ লাফাতে লাফাতে অপারেশন থিয়েটারের দিকে যায়।
ঘুম আসছেনা। ডাক্তার বেরিয়ে এলেন। এসে বাচ্চাটাকে রক্তমাখা হাতে তুলে ধরলেন সামনে। হ্যাঁ, হ্যাঁ। মেয়ে হয়েছে মেয়ে। মেয়ে হয়েছে আমার। কিন্তু ডাক্তার বাবু। আমি কি করব এখন? কাগজপত্র তৈরি করুন। সাতমাসের বাচ্চাকে আপনাদের নিয়মে যা করে করুন। কিন্তু, আমি কি করব ডাক্তার?
জড়িয়ে যাচ্ছিল লুঙ্গিটা। সেদিনের লুঙ্গিটা ছেড়া ছিলো। মসজিদের কারবালা ময়দানে মেয়েটাকে দাফনানো হলো। মেয়েটার নাম দেওয়া হলো। আত্মার অংশ। আত্মজা। দুমাস হলেই আল্লাহ রুহ ফুঁকে দেন।
জানাজা হবেনা। শুধু দোয়া হবে। মেয়েটাকে তুলে দেয় নাজমুল মাদ্রাসার বয়স্ক ছেলেটার হাতে। বেসরকারি হাসপাতালের কাগজ জমা দিলে তাকে দাফন করা শুরু হয়। আহা কত ছোট মুখটা। চুলগুলো। ওর মায়ের মতো শরীরের রং। চোখ গুলো খোলা। তার হাসিগুলো নেই। ছোট পা পা। স্ত্রী অঙ্গ পরিস্ফুট। চেনা যাচ্ছে।সে মেয়ে চেয়েছিল আল্লাহ তাকে মৃত মেয়ে দিল। গণেশ চতুর্থী। নাজমুল মিছিল দেখছে। তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে। ভেতরে না বাইরে?
আর কত রাত জেগে থাকবে? ঘুমাও। সাফিনা আবার জেগে উঠেছে।
ঘুমোতে পারছিনা।
বমি হলো একটু।
ঘুমাও। না ঘুমিয়ে শরীর খারাপ হবে। আমাদের আর কি? নতুন করে স্বপ্ন দেখতেও ভয় হয়। আমি স্বপ্ন দেখিনা জন্য তোমাকেও দেখতে হবেনা?
আমাকে জড়িয়ে ধরো। জড়িয়ে ধরো। যেন নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারি। নিশ্চিন্তে জলের ভেতর। যেভাবে মানুষ ডুবে যায় তেমন। চোখেমুখে জল ঢুকে যায়। রোদ যতদূর যায় ততদূর পর্যন্ত দ্যাখো। কাঁকড়া পাথর। দ্যাখো। আমি যেন জলের ভেতর ডুবে যাচ্ছি। দ্যাখো নাজমুল। আমাদের সেই কলেজের দিনগুলোতে যেমন আমরা ভেসে ভেসে বেড়াতাম। তারপর যত জায়গা ঘুরেছি। সেই পুরোনো মসজিদ। ময়দান। আত্মজা আমাকে ডাকছে বোধহয়। তুমি রাখোনা তোমার হাতটা আমার পেটে। বড় শান্তি পাই। তুমি রাখোনা, রাখলে মনে হয় আমার ছোট্ট বাচ্চাটা ভেসে বেড়াচ্ছে। যেমন তুমি আমাকে বলো তোমার স্বপ্নে নদী আসে ওইরকম আমাকেও ডুবে যেতে ইচ্ছে করে। মনে মনে অথবা ধরে নাও সত্যিকারে মরে গেলে কি হবে? তোমার আর এলহাম হয়না? ঘুমের ঘোরে স্বপ্নে যেরকম তুমি জান্নাত দ্যাখো। রাসুলকে দেখতে পাও। জিব্রাইলকে দেখতে পাও। দ্যাখো আমার মেয়েকে। তাকে কি দেখা যায়না আর? আর কোনোদিন দেখা যায়না। তোমার ইশ্বর তোমার আল্লাহ তোমাকে দেখায়না? এলহাম হয়না? তোমার মেয়ে কোথায় ফুলের চাদরে মোড়ানো। আতরে সুবাসিত। তোমার পুরোনো গল্পের মতো। নাজমুল আমাকে বলো তুমি দ্যাখোনা। বলোনা। বলো?
ঘুমের ঘোরে হারিয়ে যায় সাফিনা। ওর তলপেট জুড়ে হাত বোলাতে থাকে নাজমুল। আল্লাহ! কেন?
0 Comments
No comments yet. Be the first to share your thoughts!