রম্যরচনা

তেলের খেল

তেলের খেল
ড. গণেশ নন্দী খণ্ড 1 · সংখ্যা 1 · JULY · 2025 · 3 বার দেখা

তেলের খেল

     তেল। এই তেলের কী ত্যাল-ত্যালে মহিমা। তেল ছাড়া দুনিয়াটাই এখন ফেল। জানি, এই যুক্তির বিপরীতে একটি ভোটও পড়ার নয়। তেলের খেল প্রতিমুহূর্তে আমরা অনুভব করছি। ঘরে-বাইরে সর্বত্র। তেলের জালে সবকিছু আটকা পড়েছে। একে এড়িয়ে চলা দুর্বিষহ সংগ্রামের সামিল। এই তেলের স্বাদ ভিন্ন সময়ে ভিন্ন। তেল বহুরূপে আমাদের সম্মুখে বিরাজমান।

        তেলের বহু জাতি-প্রজাতি চিহ্নিত হয়েছে বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে। নিত্যদিনের প্রয়োজনীয়তায় নানাভাবে তেলের ব্যবহার চলছে। ধারা-বেধারা, তেধারা, সানলাইট, মুনলাইট বহু মনমোহিনী নাম নিয়ে প্রতিদিন বাজারজাত হচ্ছে তেল। মানুষকে কাছে টানছে তার রঙবাহারে, স্বাদে। সরষের তেল বাঙালি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। নাম শুনলেই জিভে জল আসে। মনে পড়ে কুড়কুড়ে, মুচমুচে ভাজা-বড়ার কথা। কালো কড়াইয়ে তপ্ত তেলে হাবুডুবু খাচ্ছে ইলিশের পালিশ করা টুকরো। সাঁতার কাটছে লালচে মালপো। সুখের দিনে সরষের তেলের উপস্থিতি নিঃসন্দেহে লোভনীয়। এই তেল ফাট-ফাট দাম্পত্য জীবনেও ফাটাফাটি মোলায়েম ভাব জাগিয়ে তুলতে পারে।

       রাস্তার পাশে তেলে ভাজার দোকানীকে ঘিরে সব বয়সের মানুষের ভিড় অনেক সময় পাতি রাজনৈতিক নেতারও ঈর্ষার কারণ হয়ে উঠে। কারণ তাদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি শোনানোর জন্য বিনা প্রলোভনে পাঁচজন মানুষও জোটানো মুশকিল হয়ে উঠে। সেখানে গরিব তেলেভাজা দোকানীর কালো হাতের মাখামাখি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের খাবার খেতে হাজির হন বিদগ্ধ, বুদ্ধিজীবীরাও। প্রলোভন এখানে শুধু তেলে ভাজার চড়চড়ে শব্দ এবং তেল-মশলার কোয়ালিশনে সৃষ্ট ম ম গন্ধ। সরষের তেল গায়ে না মাখলে কুস্তিগীর ময়দানে নামেন না। তেল চুকচুকে শরীর থেকে আলো টিকরে না বেরোলে পালোয়ানের কুস্তিতে মেজাজ আসে না। এটা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি।

         সরষের তেল ছেড়ে দিলেও রয়েছে পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিন, আলকাতরা। এগুলোও তেল। পেট্রোল, ডিজেল নামের তেল প্রজাতি পৃথিবীর এখন সব কোন্দলের মূল কাঠি। সভ্যতার নিয়ন্তা। এই তেল এ পর্যন্ত কত ইতিহাস সৃষ্টি করেছে, আরও কত করবে কেউ বলতে পারবে না। তেল সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়েছে যেমন, তেমনি পিছিয়েছেও অনেক। বহু ধ্বংসের প্রতীক তেল। বহু গণহত্যার প্রতীক তেল। তেলের জন্য ইরান, ইরাক সমৃদ্ধশালী। তেলের জন্যই তারা বিপর্যয়ের মুখোমুখি।

      তেলের কুয়ো দখল করতে মধ্যপ্রাচ্যের উপর বারবার ছড়ি ঘোরাচ্ছে আমেরিকা। তেল পেতে আমেরিকা সৃষ্টি করছে লাদেনের, আবার লাদেনকে ধরার নামে গুঁড়ো করছে আফগানিস্তানকে। নিজের তেল বেহাত হওয়ার ভয়ে লাদেন গুঁড়ো করছে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের গগনচুম্বী ইমারত। ইরাকের তেলের জমিদারি নিতে সাদ্দামের প্রতি যত গোঁসা বুশ বাবাজির। চালাও আক্রমণ ইরাকে। ধ্বংস হলো হাজার হাজার বছরের সমৃদ্ধশালী ঐতিহাসিক শহর। ফাঁকতালে কচু কাটা হলেন সাধারণ নিরীহ মানুষ। পঙ্গু হলো বিশ্বের পরবর্তী প্রজন্ম। এর সবকিছুর মূলে তেল।

       জনস্বার্থ বিরোধী যে সরকার গদিতে বসবে নিজেদের রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে চোখ বুজে তেলের দাম বাড়াবে। কোনও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বা অর্থনীতিবিদের প্রয়োজন নেই। শিরঃপীড়া সৃষ্টিকারী কোনও ভাবনার অবকাশ নেই। লালু মার্কা, আলু মার্কা, গোমুখ্যু অর্থমন্ত্রী হলেও এপথ অনুসরণ করবে। নির্বাচনে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করে গদিতে বসে রাজকোষে অভাব দেখলে তা পূরণে তেলের দাম বৃদ্ধির ঐতিহ্য বহুকাল ধরে চলে আসছে। তেলে ভর দিয়ে চলে সব যানবাহন। তেলের দাম বাড়লে বাড়বে পরিবহনের ভাড়া। পরিবহনের মাসুল বৃদ্ধির অর্থ সব ধরনের জিনিসের মূল্যবৃদ্ধি। তেলের খেলে যাঁতাকলে পড়বেন সাধারণ মানুষ এটা অবধারিত। যার জন্য নিজেদের পকেট ভর্তির উদ্দেশ্যেও মন্ত্রীদের কাছে তেল হচ্ছে মোক্ষম অস্ত্র। তেলের অভাবে জ্বলে না গরিবের কুপিবাতি। সন্ধ্যার পরই কুঁড়েঘরে নেমে আসে অন্ধকার। তেলের অভাবে বিঘ্নিত হয় জল সরবরাহ। এমনকী শ্মশানের চিতা জ্বালাতেও কষ্ট হয়।

         তবে আভিধানিক সংজ্ঞা এবং নির্দিষ্টকরণের বাইরে এক ধরনের ‘তেল' আজকাল জনজীবনের অঙ্গ হয়ে উঠেছে। এই তেলকে এককথায় বিশ্লেষণ করার উপায় নেই। ঘটনাপ্রবাহে এর গুরুত্ব অনুভব করতে হবে। বাতাসের মতই এই তেল স্বাদ, গন্ধহীন। এই তেল উপযুক্ত স্থানে মর্দন করতে পারলে অসাধ্য সাধন করা যায়। কলুষিত সমাজে এটা স্বার্থসিদ্ধির মহৌষধ বলা চলে। সমস্ত দেশেই এই তেল ব্যবহৃত হচ্ছে।

      এরমধ্যে সবচেয়ে সামনের সারিতে রয়েছে আমাদের শিলচর সহ বরাক উপত্যকা। সে তেল মর্দন বা তেল মালিশের এক বিরাট ইতিহাস। প্রতিদিন নতুন অধ্যায় রচিত হচ্ছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে তেল মালিশের প্রবণতা বাড়ছে। যে কাজ সহজে হচ্ছে না, সেখানে সামান্য তেল খরচ করে যদি কাজ হয়ে যায়, তাহলে কে-ই বা এ পথকে ছাড়তে চাইবে। অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজে তেল এক মহার্ঘ বস্তু। স্কুল-কলেজের প্রিন্সিপাল বা পরিচালন কমিটির হোমরা-চোমরা ব্যক্তিদের তেল মালিশ করে নিজের সন্তানদের ভর্তি করানোর বিষয় তো এখন অত্যন্ত সস্তা হয়ে গেছে। না হয় একটু নীতি-বিবেক বিসর্জন হলই, তবুও ছেলের একটা হিল্লে হল এমনটাই মনে করেন তারা।

         অফিসে কোনও কাজের জন্য ঘুরে ঘুরে যখন চপ্পল ক্ষয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়, তখন কয়েক মিনিটের তেল মালিশ সব যন্ত্রণার উপশম করে দিতে সমর্থ হয়। এই তেল মালিশকে তোষামোদ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। রাজা-রাজড়ার আমলে পয়সা দিয়ে তোষামোদকারীদের রাখা হত। এখন অভাব, দৈন্যতা, সঙ্গে বিবেক বর্জিত স্বার্থের দুনিয়ায় ব্যক্তিগত কাজেই তোষামোদ বা তেল মালিশকে ব্যবহার করা হয়। শিলচরের নামকরা অফিসের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা মধ্যবয়স্ক এক মহিলা কর্মী। গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার ফায়দা উঠাতে সবসময়ই ব্যস্ত থাকেন। পদের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে তার কাছে আসা প্রত্যেক মানুষকেই হয়রানির মুখে ফেলেন। এমনটা অবশ্য বিভিন্ন অফিসের কেউকেটারা করে থাকেন। ওই মহিলার কাছে এক কাজের জন্য অন্তত পনেরো দিন ঘুরেছেন এক ভদ্রলোক। তবু ফাইল নড়ে না। মহিলা ঘুষ নেন না এটাও এক সমস্যা। হিল্লে হচ্ছে না দেখে ভদ্রলোক মোক্ষম অস্ত্র প্রয়োগ করলেন। বললেন- ‘ম্যাডাম, আপনি এত বড় পোস্টে কাজ করেন, কত দায়িত্ব, কত ঝামেলা, এতসব সামলান কেমন করে।' তারপর এই বয়সে তিনি এমন ফিগার ধরে রেখেছেন কীভাবে, কত ছাইপাস প্রশংসা। ব্যস, নাড়ি ধরে টান দিতেই ভদ্রমহিলা যেন গলে পড়ে যাবেন। পরদিন শুধু ফাইল নড়ল না। বহু মাইলস্টোন এক লাফে টপকে গেল। বুঝুন, ঠ্যালা।

      পুলিশ থানায় কনস্টেবলকে ইন্সপেক্টর সম্বোধন করে অনেক কাজ হাসিল করা যায়। কোর্টের পেয়াদা বা যে কোনও অফিসের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীকে স্যার বলে স্বার্থসিদ্ধি করা অত্যন্ত সহজসাধ্য ব্যাপার। বড় অফিসারকে অধস্তন কর্মীদের নিয়মিত তেল মর্দন করে বিশ্বাসভাজন হওয়ার চেষ্টা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। তবে বরাকের বাজনৈতিক মহলে তেল মর্দন বা তেল মালিশের চর্চা অনেকেরই চক্ষু লজ্জার কারণ হয়ে উঠেছে। এখানে ‘তেল মারা' শব্দটা অত্যন্ত পরিচিত। আমাদের কোন জন্মের পুণ্যের ফলে বহু দাদা, বহু মন্ত্রীকে নিয়ে আমরা ঘর করছি। এখানে প্যাকাটি মার্কা নেতা যেমন আছেন, তেমনি কুমড়ো পটাস নধর সাইজের নেতারাও আছেন। অনেকের আবার মন্ত্রিত্বের জৌলুসে গোলাপী আভা গাল থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছে। সেই আলোয় আলোকিত হওয়ার আশায় পতঙ্গের মত অসংখ্য পাতিনেতার ভিড় সবসময় ছেঁকে ধরে আছে দাদাদের। দাদাদের কাছের মানুষ হওয়ার নির্লজ্জ প্রয়াস আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষকে চরম লজ্জার মুখে ফেলে দেয়। অবশ্য এভাবে তারা কাছের মানুষ হচ্ছেও। তোষামোদে, তোষামোদে তুষ্ট দাদার আশীর্বাদে তাদের বাড়ি হচ্ছে, গাড়ি হচ্ছে, মিলছে প্রতিষ্ঠাও। দিনরাত দাদার নামে চলছে গুণকীর্তন। দাদার জনহিতকর কার্যকলাপের ফিরিস্তিকে ফুলিয়ে, ফাঁপিয়ে বেরোচ্ছে গানের ক্যাসেটও। বরাকে যা কিছু হচ্ছে সব দাদাদের দয়ায়। ‘দাদা স্বর্গ, দাদা ধর্ম, দাদা হি পরমন্তপ’ অসংখ্য ভক্তবৃন্দের কাছে। ল্যাং মারার আদর্শে বিশ্বাসী ভক্তরা একে অন্যকে ল্যাং মারছে, মুখ ভ্যাঙাচ্ছে। আবার মুখ ফিরিয়ে দাদার দিকে সহাস্য বদনে চেয়ে আছে একান্ত বাধ্য ছাত্রের মত। দেঁতো হাসি ঠোঁটের কোণে পড়ছে চুঁইয়ে চুঁইয়ে। সেইসঙ্গে মিথ্যা স্তুতি চলছে। ডাইনে বাঁয়ে। দাদা যদি কাউকে প্রশংসা করবেন বলে মনস্থ করেন, দাদা ভক্তরা তিন পা এগিয়ে প্রশংসার কাব্যগ্রন্থ রচনা করে বসেন। দাদা যদি কারও প্রতি বিরক্ত হন, ভক্তদের রাগ তখন দর্শনীয় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। গালিবর্ষিত হবে নন-স্টপ ডিস্কোর মত, দাদার পক্ষে বিরক্তিকর ব্যক্তিকে পারলে মেরে পাট করে দেওয়ার মত জীবন্ত অভিনয় করেন তারা। সবকিছুর উদ্দেশ্য দাদার নধর তনুর স্পর্শ পাওয়া। আরও কাছের মানুষ হওয়া।।

      এভাবে তোষামোদ, স্তুতিবাক্য তেল মর্দনে দাদারাও বিগলিত হন। দুহাতে কৃপা বর্ষণ করেন সব ক্লাসের নেতাদের, চ্যালাদের। যদিও সাম্প্রতিককালে বরাক উপত্যকায় দাদা ভজনের বদলে এখন মামা ভজন নতুন ট্রেন্ড হতে দেখা যাচ্ছে। তবে বরাক থেকে দিশপুর, দিশপুর থেকে দিল্লি- এই তেল মর্দন আর ভজন কীর্তন প্রক্রিয়া অব্যাহত। সমস্ত রাস্তাটাই যেন ত্যালতেলে। আবার এই তেল মালিশে তৃপ্ত, তন্দ্রাচ্ছন্ন দাদাকে বা মামাকে ভক্তরাই যে রসাতলে নিয়ে যান এটা পোড় খাওয়া বহু দাদা, মামাও অনেক সময় টের পান না। এটাও এক বিস্ময়ের ব্যাপার। সব মিলিয়ে বরাকে ‘তেল মালিশ' এখন উপাদেয় এবং অপরিহার্য বস্তু। এখানে প্রতিবাদ কাজ করে না, তেল বেশি কাজ করে। ব্যাপক সংখ্যক মানুষ এপথ ধরেছেন। বাকি বিবেকবান, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন, প্রগতিশীল প্রতিবাদী মানুষও সে পথ ধরবেন কি না সেটা সময়ই বলবে।

3 বার দেখা 0 বার শেয়ার

0 Comments

No comments yet. Be the first to share your thoughts!

লেখক: ড. গণেশ নন্দী
লেখকের পাতা দেখুন