নজরুলের পাখি
নজরুলের পাখি
“আমায় নহে গো-ভালবাস শুধু ভালবাস মোর গান” ক্যাম্পাসের অডিটোরিয়ামে সজল যেদিন এই গানটি গাইল। সেদিনের পর থেকেই ওকে সবাই নজরুলের পাখি নামে চেনে। নজরুলের গানই তার ধ্যান, জ্ঞান। ক্লাসে তার উপস্থিতি কম হলেও শিক্ষকরা সজলকে গুণীর নজরে দেখতেন। ওর বেশ কিছু টিউশনিও ছিল। সবগুলোই গানের। বলা চলে দুপুর থেকে রাত অব্দি বাড়ি বাড়ি সুরের সেবা দিয়ে যাওয়া। গানের টিউশনি মানেই বছরের ৬ মাস চালু তো ৬ মাস পরীক্ষার অজুহাতে বন্ধ পড়ে থাকা। তার উপর উপযুক্ত পারিশ্রমিক, প্রত্যাশাতেও জোটে না। এভাবেই সুরের নেশায় সজলের ছুটে চলা এ বাড়ি-ও বাড়ি। শহরের এক সরকারি চাকরিজীবীর ছেলেকে গান শেখাতে যায় সজল। বাড়ির পরিবেশ ভালো তবে অতীতের রাজকীয় গানের পরিবেশ যেমন বই পুস্তকে মেলে, সজলের বাস্তবতায় তা কোন দিক দিয়েই যেন মেলে না। ডাইনিং রুমের এক কোণে পুরনো মাদুরের উপর একটা যত্নহীন নতুন হারমোনিয়াম আর গাব উঠে যাওয়া পুরনো তবলা। পাশেই বেসিন। গান শেখানোর সময় কেউ বেসিনে হাত ধুতে গেলে গায়ে জলের ছিটে আসে কখনো-সখনো। তার উপর ছাত্র ভীষণ অমনযোগী। যদিও প্রযুক্তির বিশ্বায়নে আজকাল তা স্বাভাবিক। শুরুটা ক্ল্যাসিক্যাল আর নজরুলের গান দিয়ে হলেও বাবা মায়ের ইচ্ছা, ছেলেকে এসব সেকেলে জিনিস শেখানো যাবে না। তার বদলে এ সময়ের ভাইরাল গান শিখিয়ে দু-চার মাসে স্টার বানিয়ে দিতে হবে। সজল সব শোনে কিন্তু অবাক হয় না৷ বর্তমান সময়ে এর বেশি প্রত্যাশা করাও যে অনুচিত! এভাবেই ফরমায়েশি গান শেখানোর পাখি হয়ে উঠে সজল। সে বাড়িতে সজল ছাড়াও সজলের মত দু-তিনজন শিক্ষকের যাতায়াত ছিল। তাদের কেউ অংক কিংবা ইংরেজির শিক্ষক। কখনও কখনও সজলের গান শেখানোর সময়ের তারতম্য নির্ভর করতো সেইসব শিক্ষকদের আসা যাওয়ার উপর। সজল সে অসুবিধেটুকুও মেনে নেয়। এভাবেই চলতে চলতে একদিন খবর আসে। সজলের ছাত্র অংকে ভীষণ খারাপ করেছে। ছাত্রের বাবা মা সজলকে ডেকে জানিয়ে দেয়। ছেলেকে আর গান শেখাবে না। বাবা মায়ের ধারণা, ছেলে গানের জন্যই দিন দিন এমন অমনোযোগী হয়ে উঠছে। সজল জানত গানের সাথে তাল, তালের সাথে অংকের যোগসূত্র। কিন্তু অংকের সাথে যে ফেল করার যোগসূত্র আছে, তা বোধ করি সজলের জানা ছিল না। মাসের অর্ধেক টাকা হাতে ধরিয়ে যখন সজল বিদায় নিচ্ছিল তখন টেবিলে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিল এক শিক্ষক। তাদের প্রত্যেকের পড়ানোর সময় খানিকটা বেড়েছে, বেড়েছে বেতনের অংকও। অথচ সজলের বেড়েছে গান নিয়ে বেঁচে থাকার অফুরন্ত দুর্ভোগ। এ শহরে সজল চেয়েছিল ছড়িয়ে দিতে নজরুলের সুবাস। কিন্তু যে শহরে সজলের মত গানের পাখিরাই ঠিকঠাক বাঁচতে পারছে না, সে শহরে নজরুলের গান তো অনেক দূরের ব্যাপার!
0 Comments
No comments yet. Be the first to share your thoughts!